December 22, 2024, 4:42 pm
মোঃ আজিম উদ্দীন//
বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশে কিছু মানুষ সউদী আরবের সাথে রোজা শুরু করছেন এবং তাদের সাথে একই দিনে ঈদ করছেন। তাদের একাজে যে জিনিষটি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, তা হল একটি উপলব্ধি। উপলব্ধিটা হল, হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখতে শুররু কর এবং চাঁদ দেখে রোজা রাখা সমাপ্ত কর।’ একটি দেশের সব নাগরিক তো আর চাঁদ দেখে না, বেশির ভাগ মানুষ খবর শুনেই রোজা-ঈদ করে। আর যেহেতু সউদী আরব আমাদের চেয়ে আগে চাঁদ দেখে, তারা আমাদের ইসলামের কেন্দ্রভূমি, আমরা তাদের চাঁদ দেখার খবর শুনতে পারছি। টিভি চ্যানেল থেকে আমরা তাদের দেশের খবর দেখতে পাচ্ছি। আবার সেদেশে কর্মরত আমাদের আপনজনরা রয়েছে তারা মোবাইল ফোনেও আমাদেরকে জানাতে পারছে। কাজেই তাদের দিনেই আমাদের রোজা এবং ঈদ হওয়া উচিৎ।
তারা এটাও বলে থাকেন যে, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে যে বিভিন্ন দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুসলমানদের দেশ খন্ড খন্ড হয়েছে, নতুন নতুন বর্ডার হয়েছে। ফল স্বরূপ অনেক বিষয়ে দেশে দেশে ভিন্নতা এবং দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমরা এসব বর্ডার মানি না। আল্লাহ এক রাসূল এক, শবে কদর এক। সব একই দিনে হওয়া উচিৎ।
তারা আরো মনে করেন, আল্লাহ তাআলা যে তাঁর বিশেষ রহমত নিয়ে দুনিয়ার নিকটবর্তি আসমানে অবতীর্ণ হন, বান্দাদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ বর্ষণ করেন, তা তো আর ২/৩ দিন করেন না, একই দিনই করেন। সুতরাং এসব এবাদত দুনিয়া জুড়ে কেন আলাদা আলাদা দিনে অনুষ্ঠিত হবে? একই দিনে হওয়া উচিৎ।
উপরিউক্ত যুক্তিগুলো বিবেচনায় নেওয়ার পর, পাঠক, আসুন আমরা দেখি এব্যাপারে ইসলামী শরিয়ত, বিজ্ঞান এবং আমাদের আকল বা জ্ঞান কী বলে।
হাদীছঃ কুরাইব রা. থেকে বর্ণিত। হারিসের কন্যা উম্মুল ফজল তাকে সিরিয়ায় মু’আবিয়া রা. এর নিকট পাঠালেন। কুরাইব বলেন, অতঃপর আমি সিরিয়া পৌঁছে তার প্রয়োজনীয় কাজ সমাপন করলাম। আমি সিরিয়া থাকতেই রমযান মাস এসে গেল। আমি জুমুআর রাতে রমযানের চাঁদ দেখতে পেলাম। অতঃপর মাসের শেষ দিকে আমি মদীনায় ফিরে এলাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রোযা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কখন চাঁদ দেখেছ? আমি বললাম, আমি তো জুমআর রাতেই চাঁদ দেখেছি। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিজেই কি তা দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, অন্যান্য লোকেরাও দেখেছে এবং তারা রোযা রেখেছে। এমনকি মু’আবিয়া রা. ও রোযা রেখেছেন। তিনি বললেন, আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেকেছি, আমরা পূর্ণ ত্রিশটি রোযা রাখব অথবা এর আগে যদি চাঁদ দেখতে পাই তাহলে তখন ইফতার করব। আমি বললাম, আপনি কি মুয়াবিয়া রা. এর চাঁদ দেখা ও রোযা রাখাকে রোযার মাস শুরু হওয়ার জন্য) যথেষ্ট মনে করেন না? তিনি বললেন, না রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলিম শরীফ, হাদীছ নং২৩৯৬, অনুবাদ ইসলামী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
বিশ্লেষণঃ
এই হাদীছটি ইমাম আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (মুসলিম শরীফের গ্রন্থকার) র. যে অনুচ্ছেদে সংকলন করেছেন, সে অনুচ্ছেদের নাম তিনিই দিয়েছেন নিম্নরূপঃ
“নিজ নিজ শহরে চন্দ্রোদয়ের হিসাব অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এক শহরের চন্দ্রোদয়ের হুকুম উল্লেখযোগ্য দূরত্বে অবস্থিত অন্য শহরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।”
এই শিরোনাম দেখে আমরা একথা অত্যন্ত সহজভাবেই বুঝতে পারলাম যে ইমাম মুসলিম ও সারা পৃথিবীর সকল দেশকে এক সাথে ঈদের নামায পড়তে হবে এ মত পোষণকারী ছিলেন না। যদিও চাঁদ দেখার সংবাদ বিশ^স্ত সূত্রে অবগত হওয়া যায়।
এ হাদীছে সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ ও বলেছেন যে আমরা আমাদের চাঁদ দেখা অনুযায়ীই কাজ করব। আর একথাটা তিনি বললেন যে রাসূলুল্লাহ সাঃ ই আমাদেরকে এমনটা শিখিয়েছেন।
এখন আমাদের প্রশ্ন হল, আল্লাহর রাসূলের সাহাবী হাদীছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছেন, আমরা কি তার চেয়েও বেশি বুঝতে শিখে গেলাম? আবার যিনি হাদীছের ইমাম মুসলিম শরীফের মত হাদীছ গ্রন্থের যিনি সংকলক, তিনিও যে মত পোষণ করতেন আমরা কি তার চেয়েও বেশি হাদীছ বুঝতে শিখে গেলাম? নাকি তাঁর চেয়েও একধাপ বেশি মুত্তাক্বী হয়ে গেলাম? আসলে আমরা যেটা করছি সেটা হল উম্মার মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করছি। অথচ ঈমানদারদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টিকে কুরআন ও হাদীছে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তারা এমন একটা মত পোষণ করছে, যার পেছনে কুরআন-হাদীছের কোন সমর্থন নেই । আর এমতকে অবলম্বন করে তারা গোটা দেশের মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে ভিন্ন দিনে রোজা-ঈদ করেছেন। এটা একগুঁয়েমী হতে পারে, এটা কোন সওয়াবের কাজ হতে পারে না।
এখন আসা যাক বিজ্ঞান ও যুক্তি ভিত্তিক আলোচনায়ঃ
সারা বিশ্বে কি একই সময়ে দিন রাত হয়?
যারা সারা বিশ্বে একসাথে রোজা-ঈদ-শবে ক্বদর করার কথা বলছেন, তারা এ বিষয়টি বিবেচনা করেননি যে এমতের উপর আমল করা আদৌ সম্ভব কিনা। পাঠক আমরা এখন দেখব সউদী আরবের সাথে দুরবর্তী কিছু দেশের সময়ের কেমন পার্থক্য।আমরা জানি সারা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মুসলমানগণ বাস করছেন। কাজেই তাদের রোজা, শবে ক্বদর এবং ঈদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। ইসলামী শরীয়ত তো শুধু দুই একটি দেশের জন্য নয়, ইসলামী শরীয়ত গোটা পৃথিবীর জন্য। ধরা যাক পশ্চিমে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের কথা। মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে ৫০টি অঙ্গ রাজ্য রয়েছে। তাদের সময়ের ও পার্থক্য রয়েছে।
আমরা ধরি আলাবামা অঙ্গ রাজ্যের কথা। এখানকার মান সময় হল ইউটিসি মাইনাস ৬ ঘন্টা। আর সউদী আরবের মান সময় হল ইউটিসি প্লাস ৩ ঘন্টা। তাহলে সউদী মান সময়ের সাথে আলাবামার মান সময়ের পার্থক্য হচ্ছে ৯ ঘন্টা। এখন দেখি যে রাতে সউদী আরবের লোকজন মসজিদে হারামে রাত সাড়ে ৮ থেকে এশা এবং ক্বদরের উদ্দেশ্যে কিয়ামুল্লাইল করবেন। হয়ত রাত ৪ টা বা সাহরির শেষ পর্যন্ত তারা শবে ক্বদরের ফজিলত লাভ করতে পারছে। এখন আমরা দেখব এই সময়ের মধ্যে আলাবামাবাসীদের সময় কয়টা বাজবে। ৮:৩০ (সাড়ে আটটা) থেকে ৯ ঘন্টা বিয়োগ করলে, সউদী আরবের মসজিদে হারামের এশার জামাআতের সময়ে আলাবামার মান সময় হবে ১১:৩০ (সাড়ে এগারটা)। আর মসজিদে হারামের মুসল্লীগণ যখন তাঁদের শেষ সময়ে পৌঁছে যাবেন রাত ৪ টার সময়ে তখন আলাবামার সময় হবে সন্ধ্যা ৭ টা। তখন তাদের কেবল সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়। তাহলে যারা বলছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তো ২/৩ রাতে শবে ক্বদরের রহমত বরকত নিয়ে নাজিল হবেন না, কাজে কাজেই যেদিন এবং যেসময় সউদী আরবে তিনি রহমত দিচ্ছেন, প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আমরা সেই সময়টা জেনে নিয়ে, তাদের সাথে একই সময়ে এবাদতে মশগুল হয়েই কেবল সেই পূণ্যময় সময় এবং এর ফজিলত ও বরকত লাভ করতে পারি।’ তারা কি বলবেন, যে আলাবামাবাসী কোন মুসলমান শবে ক্বদরের সওয়াব লাভ করতে হলে তাদের স্থানীয় সময় বেলা ১১:৩০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এশা, ক্বিয়ামুল্লাইল দোআ ইস্তেগফার করতে হবে? অথবা এশা না পড়লেও ক্বদরের উদ্দেশ্যে নফল নামায তো এই দিনের বেলায়ই পড়তে হবে, এতে কোন ভুল নেই। আমরা বলব এতে ভুল আছে। অবশ্যই ভুল আছে। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুরা ক্বদরে লাইলাতুল ক্বদরের যে ফজিলতের কথা বলেছেন, সেটা তিনি বার বার করে বলেছেন যে সেটা হচ্ছে রাত এবং এ ফজিলত চলতে থাকে ফজরের উদয় পর্যন্ত। কাজেই দিনের বেলা ফজিলত তালাশ করা কুরআনের বর্ণনার বিপরীত। আর না হয় বলতে হবে তোমার জন্ম আমেরিকায়? তুমি জন্মগত কারণেই লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত থেকে মাহরুম। তোমার ভাগ্যে লাইলাতুল ক্বদর নেই।
পশ্চিমের পরে এবার আসুন পর্ব দিকে। জাপানের কথা ধরুন। যেখানকার মান সময় সউদী আরবের মান সময় থেকে ৭ ঘন্টার পার্থক্য। এখানে সউদী আরবের চেয়ে আগে সূর্য ওঠে। সউদী আরবে যখন এশার নামায হবে ৮:৩০টায় তখন জাপানের টোকিও শহরের সময় হবে রাত ৩:৩০টা। তারা যখন এশার নামায শেষ করবে ১৫মিনিট মত লাগবে, অর্থাৎ ৮:৪৫ বাজবে তখন জাপানের টোকিওতে রাত ৩:৪৫। তখন ওখানে সাহরির সময় আর আছে ১৫মিনিট। এখন তারা যদি সউদী আরবের পূণ্যসময়ের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে চায়, তাহলে কিভাবে করবে? এই ১৫মিনিটে তারা সাহরী করবে, নাকি নফল নামায পড়বে? নাকি জাপানে জন্ম হওয়ার কারণে তাদের ভাগ্যে মাত্র ১৫ মিনিটের শবে ক্বদর আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন, এর বেশি তাদের ভাগ্যে নেই। আবার যদি বলা হয়,“আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উপর জুলুম করেন না।” তাহলে তাদের জন্যও শবে ক্বদরের সময় প্রায় ৮ ঘন্টা বরাদ্দ করেন। তাহলে রাত সাড়ে তিনটা থেকে ৮ঘন্টা যোগ করলে তাদের বেলা ১১:৩০ পর্যন্ত লাইলাতুল কদরের নফল নামায এবং দোআ-মোনাযাত করতে হবে। তবেই সউদী আরবের সাথে একই সময়ে একই পূণ্য হাসিল করা সম্ভব হবে। এটা কি সম্ভব? না, এটা সম্ভব নয়, কারণ এটা কুরআন বিরোধী। কুরআন শবে ক্বদরকে দিনের বেলায় বলে না।
এমতের অনুসারীরা সারা বিশ্বকে একসাথে বিবেচনায় নেননিঃ
আমরা জানি আমাদের নবী সাঃ বিশ্বনবী। তাঁর শরীয়ত সারা বিশ্বের জন্য। কাজেই ইসলামের কোন বিধান, কুরআন-হাদীছের কোন ঘোষণা শুধু সউদী আরব, বাংলাদেশ বা আর দু’একটা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাজেই আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে আমরা বাংলাদেশীরা সউদী আরবের চেয়ে ৩ ঘন্টা পার্থক্যের অবস্থানে আছি, আমাদের জন্য সউদী আরবের সাথে যে রোজা-ঈদ করা সম্ভব, সেটা পৃথিবীর সব দেশের জন্য সম্ভব কিনা।
আল্লাহ তাআলার নিয়মে কি পরিবর্তন সম্ভব?
আমরা যে বলছি, “আমরা সউদী আরবের চাঁদ ওঠার খবর জানতে পারছি। তারা কবে কখন ঈদ করছে তাও আমরা জানতে পারছি। কাজেই তাদের সাথে আমাদের রোজা ঈদ করতে সমস্যা কোথায়?” আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, কবে থেকে আমরা জানতে পারা শুরু করেছি? মনে হয় ৫০ বছরও হয়নি। এর আগে তো আমরা তাৎক্ষণিকভাবে জানতাম না সউদী আরবে কখন চাঁদ উঠছে, আর কবে তারা রোজা শুরু করছে আর কবে ঈদ করছে।ফলে আমরা বাংলাদেশীরা সবাই তাদের চেয়ে একদিন পরেই রোজা শুরু করতাম, একদিন পরেই ক্বদরের নামায পড়তাম এবং একদিন পরেই ঈদ করতাম। কবে থেকে বাংলাদেশে মুসলমানদের বাস জানি না। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ বিন কাসিম ভারতে অভিযান করেছিলেন। আর মুসলিম বণিকগণ তার আগ থেকেই এদিকে আসতেন। আর এখন ২০২০ সাল। তাহলে ১৩০০ বছর পেরিয়ে গেছে। বলতে পারি অন্ততঃ১৩০০ বছর মানুষ সউদী আরবের সাথে রোজা, ক্বদর এবং ঈদ পালন করেনি। আমাদের প্রশ্ন হল, এই যে ১৩০০ বছর তারা সউদী আরবের সাথে এই পূণ্য আমলগুলো করতে পারলেন না, এর ফলে কি শত শত বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ যে শবে ক্বদরের এবাদত বন্দেগী করেছেন, তা কি শবে ক্বদরের এবাদত হিসেবে আল্লাহ তাআলা নেননি? হয়ত একই দিনে ঈদ করার সমর্থক ভাইয়েরা বলবেন, অজানা সময়ের বিষয়টা ওজর হিসেবে গণ্য হবে। এখন আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সব জানতে পারছি, এখন আর আগের মত করলে চলবে না। তাহলে আমাদের আর একটি প্রশ্ন থেকে যায়, তাহল বিজ্ঞানের অগ্রগতি যখন আসেনি, তখন আমদের বাংলাদেশীদেরকে আল্লাহ তাআলা শবে ক্বদরের সওয়াব দান করতেন, সউদী আরবের পরের দিন। আর বিজ্ঞানের অগ্রগতি অর্জিত হয়ে যাওয়ার পরে হঠাৎ কোন এক সাল থেকে আল্লাহ তাআলার পূর্ব রীতির পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আর সউদী আরবের সাথে না মিললে শবে ক্বদরের সওয়াব দিবেন না। বিষয়টা যেন এমন মনে হচ্ছে যে, অফিসিয়াল নোটিসের মত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোন একদিন নোটিস জারি করা হয়েছে, “হে লোক সকল, এখন থেকে তোমরা সারা বিশ্বের লোক একই দিনে রোজা-ঈদ ইত্যাদি করবা, অন্যথায় তোমাদের এসকল এবাদত আমি কবুল করবা না।” আর আমাদের মধ্যেকার সীমিত কিছু দীনি ভাই সেই নোটিসটা পড়ে এসেছেন এবং তারপর থেকে এ নতুন মত অবলম্বন করেছেন! আল্লাহ তাআলা বলেন,“তুমি আমার নীতিতে কোন পরিবর্তন পাবে না।” আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাআলার নীতিতে কোন পরিবর্তন হয় না, পরিবর্তন হয়নি, এবং পরিবর্তনের কোন প্রয়োজনও পড়ে না।
রোজা শুরু সিদ্ধান্ত নিতেও রাত ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবেঃ
ধরুন এখন শা’বান মাসের শেষ প্রান্তে আমরা আছি। রমজানের চাঁদ ওঠার সময় এসে গেছে। জাপানে আমাদের বাস। সউদী আরবে সন্ধ্যা ৭টায় সূর্য অস্ত যাবে। তারপর মাগরিব নামায এবং চাঁদ দেখা শেষ করে মিডিয়ায় সম্প্রচার হতে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগবে। তাহলে বাজবে আটটা। সউদীতে যখন আটটা, জাপানে তখন রাত তিনটা। সউদীতে চাঁদ দেখা গেল কিনা সেটা জানার জন্য যদি লোকজন উদগ্রীব থাকে, তাহলে গোটা জাপানের মুসলমানকে রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে থাকতে হবে। আর যদি তারা ঘুমিয়ে থাকে তাহলে রাত তিনটার সময় সকল ঘুমন্ত মুসলিম জনতাকে রাত তিনটার সময় ঘুম থেকে জাগানো এক বাহিনী রাস্তায় নামাতে হবে। এরপর ডাকতে কতক্ষণ লাগবে সেটা পাঠক অনুমান করুন এরপর সাহরী খাবে, নাকি? কিয়ামুল্লাইল বা তারাবী নামায আদায় করবে! অগত্যা প্রথম রাত তারাবী বাদই দিতে হবে। তাতে কোন সন্দেহ নেই। আবার যদি জেগে থাকে, আর প্রথম সম্ভাবনার রাতে চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে রাত তিনটা পর্যন্ত রাত্রি জাগরণের পর সবাইকে ঘুমাতে যেতে হবে। এই হল অবস্থা! আল্লাহ তাআলা কি দীনকে এতই কঠিন করে দিয়েছেন?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
আল্লাহ তোমাদের জন্য যাহা সহজ তাহা চাহেন এবং যাহা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তাহা চাহেন না।সুরা বাকারা,১৮৫।
বিষয়টা কি এই যে, সবদেশকে সউদী আরবের সাথে ঈদ করতে হবে? তাহেলে তো চাঁদ দেখেও রোজা-ঈদ না করে অপেক্ষা করতে হবে!
সউদী আরব আমাদের বাংলাদেশ থেকে ৩ ঘন্টা সময়ের পার্থক্যের দূরত্বে পশ্চিম দিকে অবস্থিত। তারা আমাদের চেয়ে ১ (এক)দিন আগে চাঁদ দেখে। আর আমরা তাদের চাঁদ দেখার সংবাদ অবগত হয়ে, নিজেরা চাঁদ না দেখেও রোজা শুরু করলাম। আবার এমন দেশও তো আছে যারা সউদী আরবের চেয়ে পশ্চিমে ৩ ঘন্টা বা এর চেয়েও বেশি সময়ের পার্থক্যের দূরত্বে অবস্থিত। তারাও তো সউদী আরবের চেয়ে আগে চাঁদ দেখে। যেমন সউদীগণ আমাদের চেয়ে আগে দেখেন। নিয়ম যদি এটাই হয় যে বিশ্বের সব দেশকে সউদী আরবের সাথে রোজা-ঈদ সবকিছু করতে হবে, তাহলে পশ্চিমের যেসব দেশ সউদী আরবের চেয়ে আগে চাঁদ দেখে, তারা তো সংবাদ জানতে পারবে যে সউদী আরবে চাদা দেখা যায়নি।ফলে তারা চাঁদ দেখেও রোজা শুরু করতে পারবে না কারন তখন সউদী আরবে চাঁদ ওঠেনি। এটা কি সম্ভব? চাঁদ দেখেও রোজা শুরু না করা?
আবার ধরা যাক পশ্চিমের কোন দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ পেয়ে সউদী আরব চাঁদ না দেখেও রোজা শুরু করল। তাহলে তারিখটা ফলো করা হবে সউদী আরবের নয়, বরং পশ্চিমের সেই দেশের যে দেশের চাঁদ দেখার উপর সউদীরা নির্ভর করবে। ফলে, যে তারিখে রাসূল সাঃ এবং সাহাবীগণ শবে ক্বদরসহ অন্যান্য এবাদত করতেন, সেই তারিখ বদলে যাবে। যেহেতু রাসূল সাঃ চাঁদ দেখতেন, সউদী আরবের মক্কা বা মদীনার আকাশের চাঁদ আর এখন হয়ে যাচ্ছে অন্য দেশের চাঁদ। যা একদিন বা দু’দিন আগেই উঠে গেছে। ফলে যে দেশে কুরআন নাজিল হল, যেদেশে রাসূল সাঃ আবির্ভাব হল, সেই দেশ মূল কেন্দ্র না হয়ে, কেন্দ্র হয়ে গেল আর এক দেশ এটা কি মেনে নেয়া যায়?
প্রযুক্তি নয়, প্রকৃতিই ধর্মীয় বিষয়গুলো নির্দ্ধারণের মূল ভিত্তিঃ
আমরা জানি যে দেশে/রাজ্যে রোজা-ঈদ উদ্যাপিত হবে, সেই দেশের/রাজ্যের মানুষ কোথাও না কোথাও খালি চোখে চাঁদ দেখবে – এটাই ইসলামের বিধান। আগে যেমন স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেঁটে চলার হিসেবে মঞ্জিল নির্ধারণ করে তিন মঞ্জিল দূরত্বের সফরকে নামায কসর করা এবং শরীয়তের অন্যান্য বিষয় নির্ধারণের জন্য ভিত্তি ধরা হত, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এখন হয়ত তিন মিনিটেই সেই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব, তাই বলে তো আগের সেই মাসআলা বদলে ফেলা যাবে না! আবার কোন বিপর্যয় দেখা দিলে প্রযুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়। সেসময় প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই হয়ে দাঁড়ায় মূল ভিত। কাজেই যে ব্যবস্থাটা পরিবর্তনশীল, যেটা চিরন্তন নয়, সেটা কখনও দীনের ভিত হতে পারে না। হ্যাঁ আনুসঙ্গিক বা সহায়ক ভূমিকায় বিজ্ঞান থাকবে, কিন্তু মূল ভিত আগের মতই থাকবে, এটাই তাকওয়ার দাবী।
আমরা যা লাভ করি তা হচ্ছে আল্লাহর রহমত।
সবশেষে আমাদের উপলব্ধি এই যে, পৃথিবীর দেশে দেশে সময় যেহেতু এক নয়। ২/১ মিনিট থেকে শুরু করে ১২/১৩ ঘন্টা পর্যন্ত সময়ের পার্থক্য রয়েছে এই পৃথিবীর এক দেশের সাথে অন্য দেশের। কাজেই সকল দেশকে একই সময় ও তারিখের আওতায় এনে রোজা ঈদ করানো সম্ভব নয়। এটা আল্লাহ তাআলা চান ও না। কারণ আল্লাহ তাআলাই পৃথিবীকে এবং গোলাকার করে সময়ের পার্থক্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।সেই আল্লাহ তাআলাই এ বিচিত্র পৃথিবীবাসীকে ভিন্ন ভিন্ন দিনে ক্বদরসহ বিভিন্ন বরকতময় দিন ও রাতের সওয়াব দান করবেন, এটা আল্লাহ তাআলার করুণা, তাঁর অশেষ রহমত। এছাড়া কুরআন নাজিলের সেই বিশেষ রাত, বিশেষ ক্ষণ ঠিক ঠিক ধরতে পারলেই সওয়াব হাসিল হবে আর ধরতে না পারলে সব মিথ্যা হয়ে গেল বিষয়টা এমন নয়। কারণ সউদী আরবের লোকজনও যদি শবে ক্বদর লাভ করে, এবং তার সওয়াব লাভ করে, তার অর্থ তো এটা নয় যে, সেই দিন কুরআন নাজিল হল, কুরআন তো কোন এক বছরের একদিনই নাজিল হয়েছে। এরপর থেকে মানুষ যেটা পায় সেটা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। কাজেই নির্দিষ্ট দিনের পরেও বছরের পর বছর ধরে যে রাব্বুল আলামীন সউদীবাসী এবং এর আশপাশের মুসলমানদেরকে তাঁর সওয়াব দান করছেন, সেই মহান রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর দূর-দূরান্তে অবস্থানরত মুসলমানকে সউদী আরবের তারিখের পরে বা আগেও তাঁর করুণা দান করবেন। এটাই তাঁর নিকট থেকে আশা করা যায়।
লেখক:
মোঃ আজিম উদ্দীন,
বি এ, অনার্স এম এ, (ইংলিশ), এম. এম,
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি,
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ, চুয়াডাঙ্গ।
Leave a Reply